হাটহাজারী মাদ্রাসায় মওদূদীবাদী জামায়াত- শিবিরের হামলার ইতিহাস।
হাটহাজারী মাদ্রাসায় মওদূদীবাদী জামায়াত- শিবিরের হামলার ইতিহাস।
রাত সাড়ে ৯টা, শ'খানেক সশস্ত্র জামাত শিবির ক্যাডার একটি ট্রাকযোগে মাদ্রাসার গেটের সামনে নেমে বিভিন্ন শ্লোগান দিয়ে মাদরাসার ভেতরে ডুকে পড়ে।
তারপর ৩/৪টা পটকা ফুটিয়ে ছাত্র- শিক্ষকদের সন্ত্রস্ত করার চেষ্টা চালায়। তারা কয়েক গ্রুপে বিভক্ত হয়ে একদল দফতরে ইহতেমাম, আরেকদল দাওরায়ে হাদীসের নৈশকালীন ক্লাস চলাকালে দাওরার শ্রেণিকক্ষের দিকে এবং আরেকটি দল পাঠাদানের জন্য ব্যবহৃত মাইকের সেট রাখা কক্ষের দিকে অগ্রসর হয়।
১৯৮৫ সালের ১০ডিসেম্বর রোজ মঙ্গলবার রাত সাড়ে নয়টায় জামাত শিবির এই হামলা করে।
শিবিরের ১ম দল হুমকি ধমকি ও অশালীন গালাগাল করে হজরত মুহতামিম সাহেবের দরজা ভাঙার চেষ্টা চালায়।
শিবিরের ২য় দল, দারুল হাদীসে উঠে মুসলিম শরীফের দরস রত উস্তাদ ও ছাত্রদের উপর আক্রমণ চালায় এবং লাথি দিয়ে কিতাবপত্র এদিক সেদিক ফেলে দিতে থাকে।
( নাউজুবিল্লা।)
এসময় দরস দানকারী মুহাদ্দিস মুফতি আযম আহমদুল হক রহ. উপায়ন্তর না দেখে সেখানেই সিজদায় পড়ে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করতে থাকেন।
ইত্যবসরে হোস্টেলে অবস্থানরত হাজার হাজার ছাত্র মাদরাসা, মুহতামিম সাহেব ও উস্তাদের রক্ষার্থে এগিয়ে আসেন। তারা ইট- পাটকেল ছুড়ে জামাত শিবির সন্ত্রাসীদেরকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন।
( উল্লেখ্য, জামাত শিবির সন্ত্রাসীদের হাতে ছিল বিস্ফোরক দ্রব্য, দা, ছুরি, কিরিচ, লোহার রড, লাঠি ও মরিচের গুড়া ইত্যাদি। আলেমদেরকে ভয় দেখাতে এনেছিল খেলনা পিস্তল। সাথে আনে মাদরাসার রুম- গেট বন্ধ করতে বিপুল পরিমাণে তালা।)
এদিকে দপ্তরে ইহতিমাম আক্রান্ত হলে হজরত মুহতামিম সাহেব থানা এবং শহরের উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের টেলিফোন যোগে সংবাদ জানিয়ে সাহায্যের আবেদন করেন।
'মুহতামিম সাহেব খুন হয়েছেন' এমন সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার তাওহীদী জনতা দ্রুত এসে মাদরাসার গেটে জড়ো হয়।
কিন্তু ভেতর থেকে গেট বন্ধ থাকায় তারা প্রবেশ করতে পারেনি। এর কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ এসে যায়।
এসময় মুহতামিম সাহেব মাইকে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে নিজের অক্ষত থাকার কথা ঘোষণা দিয়ে পুলিশদের ভেতরে প্রবশের অনুরোধ জানায়।
পুলিশের সাথে অনেক মানুষ ও ঢুকে পড়ে।
এরপর ছাত্র- জনতা চতুর্দিক থেকে জামাত শিবির সন্ত্রাসীদেরকে মুকাবেলা করেন।
এরই মধ্যে শহর থেকে পুলিশের রিজার্ভ ফোর্স এসে পৌঁছে।
উভয় ফোর্স যৌথভাবে অল্পসময়ের মধ্যে ৪১জন জামাত শিবির সন্ত্রাসীদেরকে গ্রফতার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
অনেক সন্ত্রাসী দেয়াল টপকে পালিয়ে যায়।
সংঘর্ষে অনেকে হতাহত হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রশাসন ১৪৪ধারা জারি করে।
গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে শহরের একটি আলীয়া মাদরাসা, ভার্সিটি এবং কলেজের ছাত্র শিবিররাই ছিলো।
নীল নকশা উদ্ধার :
ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ হামলার বিস্তারিত তথ্য সম্বলিত আগাম নকশা উদ্ধার করে।
নকশায় কোন কোন ভবনে শিবিরের কে কে অংশ নিবে, কে কোন দায়িত্ব পালন করবে এবং হামলাকারির সংখ্যা বর্ণনা রয়েছে। আরো ছিলো, টেলিফোন, মাইক ও গেটের দায়িত্বশীলদের তালিকা। এমনকি কিরিচ, ছুরি, লাঠি, বোতল, মরিচের গুড়া, তালা ও বিস্ফোরক দ্রব্যের বিস্তারিত বিবরণ নকশায় উল্লেখ ছিলো।
হামলার মূল উদ্দেশ্য :
জামাত শিবিরের মূল উদ্দেশ্য ছিলো :
১/ তৎকালীন মুহতামিম সাহেবকে অপসারণ করে নতুন অধ্যক্ষ নিয়োগ।
২/ বর্তমান শিক্ষকদের বহিষ্কার করে নতুন শিক্ষক নিয়োগ।
৩/ মাদরাসার কমিটি বাতিল করে নতুন কমিটি গঠন।
৪/ ছাত্রদের বহিষ্কার করে নতুন ছাত্র ভর্তি।
৫/ জামাত শিবির কর্তৃক নিয়োগ কৃত নতুন প্রশাসন সম্পর্কে প্রচার ও পত্র- পত্রিকায় সংবাদ পরিবেশন।
উপমহাদেশের অন্যতম এই দীনি প্রতিষ্ঠানে অনেকবার হামলা করতে চেষ্টা করেছে বেদাতি ও মৌদূদীবাদী জামাত শিবির।
কিন্তু আল্লাহর বিশেষ রহমতে প্রতিবারই তারা ব্যর্থ হয়েছে এবং ধুলিস্মাৎ হয়েছে তাদের নীল নকশা।
আর ১৯৮৫ সালের উক্ত ঘটনা ছিলো হাটহাজারী মাদরাসায় হামলাকারী জামাত শিবিরের ইসলাম বিদ্বেষের এক কালো অধ্যায়।
( তাওহীদী জনতা ও মাদরাসার ছাত্রদের হাতে এক শিবির সন্ত্রাসী নিহত হয়েছিল। কেন্দ্রীয় জামাত শিবির তাকে শহীদ বলে দাবি করে......!)
তথ্যসূত্র : দারুল উলুম হাটহাজারীর ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১৪৬-১৪৮।
লেখক মুফতী জসীম উদ্দীন।
উস্তাদ দারুল ইফতা, হাটহাজারী মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম।

Comments
Post a Comment